মেরিনা তাবাসসুম: স্থাপত্য যখন মানবতা ও মাটির গল্প বলে

Thu Feb 5, 2026

বাংলাদেশের সমসাময়িক স্থাপত্যকলা আজ বিশ্বজুড়ে যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তার পেছনে সবচেয়ে বড় কারিগরদের একজন হলেন মেরিনা তাবাসসুম। তিনি এমন এক স্থপতি, যিনি গ্ল্যামার বা আকাশচুম্বী অট্টালিকার পেছনে না ছুটে মনোনিবেশ করেছেন মাটির গভীরের শেকড় এবং মানুষের প্রয়োজনের দিকে। একজন প্রফেশনাল আর্কিটেক্ট বা ডিজাইনার হিসেবে তার কাজ থেকে আমাদের শেখার অনেক কিছু আছে।

১. স্থাপত্য দর্শন: মাটির কাছাকাছি থাকা (Philosophy of Contextual Architecture)

মেরিনা তাবাসসুমের কাছে স্থাপত্য কেবল ইট-সিমেন্টের গাঁথুনি নয়। তিনি মনে করেন, একটি দালানের প্রাণ থাকে তার পরিবেশে। তার নকশায় তিনটি বিষয় প্রধান্য পায়:

  • প্রাকৃতিক আলো: তিনি আলোকে একটি ম্যাটেরিয়াল হিসেবে ব্যবহার করেন。

  • বায়ু চলাচল: বাংলাদেশের আর্দ্র আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে তিনি ন্যাচারাল ভেন্টিলেশনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন।

  • স্থানীয় উপকরণ: তিনি সবসময় চেষ্টা করেন স্থানীয় মাটি, ইট এবং বাঁশ ব্যবহার করতে, যা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।

২. বাইত উর রউফ মসজিদ: এক আধ্যাত্মিক বিপ্লব

২০১২ সালে ঢাকার উত্তরায় নির্মিত এই মসজিদটি মেরিনা তাবাসসুমের ক্যারিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কাজ। এই প্রজেক্টের কিছু বিশেষ দিক:

  • ইটের বুনন: কোনো প্লাস্টার ছাড়া কেবল ইটের সুনিপুণ কারুকাজ দিয়ে এর দেয়াল তৈরি করা হয়েছে। দেয়ালের সূক্ষ্ম ছিদ্র দিয়ে যখন দিনের আলো ভেতরে প্রবেশ করে, তখন মসজিদের ভেতর এক স্বর্গীয় পরিবেশ তৈরি হয়।

  • আধ্যাত্মিকতা ও আবহ: মসজিদের ভেতর কোনো গম্বুজ নেই, পরিবর্তে পিলারের বিশেষ বিন্যাসের মাধ্যমে ছাদকে ধরে রাখা হয়েছে যা প্রাচীন সুলতানি স্থাপত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।

  • সামাজিক স্থান: এটি কেবল নামাজের স্থান নয়, বরং স্থানীয় শিশুদের পড়াশোনা এবং মানুষের আড্ডার একটি কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।

৩. স্বাধীনতা স্তম্ভ ও জাদুঘর: ইতিহাসের সাক্ষী

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা স্তম্ভ এবং ভূগর্ভস্থ জাদুঘরটি আধুনিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন।

  • আলোর স্তম্ভ: ১৫০ ফুট উঁচু কাঁচের টাওয়ারটি রাতে যখন জ্বলে ওঠে, তখন এটি স্বাধীনতার আলোর প্রতীক হিসেবে কাজ করে।

  • ভূগর্ভস্থ জাদুঘর: মাটির নিচে তৈরি এই জাদুঘরটি মানুষকে মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্ধকার সময় থেকে আলোর দিকে উত্তরণের অভিজ্ঞতা দেয়।

৪. খুদি বাড়ি: জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

বর্তমানে তিনি দক্ষিণবঙ্গের চর অঞ্চলের মানুষের জন্য কাজ করছেন। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যারা বারবার ভিটেমাটি হারান, তাদের জন্য তিনি তৈরি করেছেন 'খুদি বাড়ি'

  • এটি একটি মডুলার ঘর যা খুব সহজেই খুলে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়।

  • এতে বাঁশ এবং স্টিলের জয়েন্ট ব্যবহার করা হয়েছে যা অত্যন্ত সাশ্রয়ী।

  • এই কাজের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন যে স্থাপত্য কেবল বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন হতে পারে।

৫. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও প্রভাব

মেরিনা তাবাসসুমের কাজ আজ হার্ভার্ড থেকে শুরু করে ভেনিস আর্কিটেকচার বিয়েনালের মতো বড় প্ল্যাটফর্মে প্রশংসিত। তার উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলো হলো:

  • আগা খান অ্যাওয়ার্ড (২০১৬): যা স্থাপত্য জগতের অন্যতম সম্মানজনক পুরস্কার।

  • সোয়ান মেডেল (২০২১): স্থাপত্যে অনন্য অবদানের জন্য ব্রিটিশ রয়্যাল একাডেমি থেকে প্রাপ্ত।

  • প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তি: ২০২৪ সালে 'টাইম' ম্যাগাজিন তাকে বিশ্বের প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকায় স্থান দেয়।

FAB ADMIN

Freelancer | Mentor - Freelance Architect Mentorship (Program)